শনিবার, জুলাই ১১, ২০২০
প্রধান ম্যেনু

এক পাতায় কলারোয়ার সবকিছু

কলারোয়ার জমিদার রাণী রাশমনি

অকৃতোভয়, তেজস্বিনী, নির্ভিক বাঙালী বীরঙ্গনা রাশমুন ১৭৭৩ সালে ভারতের পশ্চিম বাংলার ব্যারাকপুরে এক দরিদ্র ধর্মপ্রান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হরে কৃষ্ণ। এগারো বৎসর বয়সে কলকাতার ধনী জমিদার বসু পরিবারের একুশ বৎসরের যুবকের সঙ্গে রাশমনির বিবাহ হয়। স্বামী ৪৩ বৎসর বয়সে মারা যান। স্বামী মারা গেলে রাশমনি বিশাল সম্পত্তির অধিকারী হন এবং জমিদারী লাভ করেন। সুদূর এ অঞ্চলটি রাণ রাশমনির জমিদারীর অন্তর্ভূক্ত হওয়ার পিছনে একটা কিংবদন্তী পাওয়া যায়। রাশমনি খুব সুদক্ষা বুদ্ধিমতী ও একজন বিশিষ্ট স্বনামখ্যাত দাবাড়ু ছিলেন। ঐ সময় চন্দনপুর, সোনাবাড়িয়া ও হোসেনপুর পরগনার (বর্তমান কলারোয়া) জমিদার ছিলেন মধু সান্ডেল ও কালু সান্ডেল। দুই সহোদর ভ্রাতা। দাবা খেলাতে এরা অশেষ অশেষ সাফল্য ও কৃতিত্ব অর্জন করেন। দাবাড়ু হিসেবে রাণী রাশমনির পরিচিতি তখন সর্বত্র। রাণী রাশমনির কথা শ্রবণ করে বড় ভাই জমিদার মধু সান্ডেল ঘোষনা দিলেন যে, যদি রানী রাশমনি দাবা খেলায় তাকে হারাতে পারেন, তাহলে এই তিনটি অঞ্চলের সম্পূর্ণ জমিদারী রাণী রাশমনিকে দিয়ে দেওয়া হবে। আর বিধবা রাণী রাশমনি পরাজিত হলে মধু সান্ডেলের সঙ্গে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। ঘোষণা মোতাবেক রাণী প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলেন। প্রচন্ড প্রতিযোগিতায় মধৃ সান্ডেল দাবা খেলায় শেষ পর্যন্ত অসহায়ভাবে পরাজয় বরণ করেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মধু সান্ডেল ও ছোট ভাই কালু সান্ডেল (বড় ভাইয়ের সম্মান রক্ষার্থে) বর্ণিত তিনটি অঞ্চল অর্থাৎ চন্দনপুর, সোনাবাড়িয়া ও হোসেনপুর/কলারোয়া পরগনার জমিদারী রাণী রাশমনিকে হস্তান্তর করেন। জমিদার রাণী রাশমনির কোন পুত্র সন্তান ছিল না। প্রথমা কন্যা রাণী জগদম্বার স্বামীর নাম ছিল মথুরা মোহন চৌধুরী । তার পৈত্রিক নিবাস ছিল পশ্চিম বাংলার ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার স্বরুপনগর থানার অন্তর্গত বিথারী গ্রামে। তিনি রাণীর বিশাল জমিদারী তদারকি করতেন। দ্বিতীয় কন্যার স্বামীর নাম ছিল যদুনাখ চৌধুরী। তার ভ্রাতা দূর্গাপ্রিয় চৌধুরী পরে হোসেনপুর/কলারোয়া পরগনার জমিদার ছিলেন। ততদিনে হোসেনপুর কলারোয়া নামে সবখানে পরিচিত। দূর্গাপ্রিয় চৌধুরীর বড় ভাই চন্ডিচরণ চৌধুরী, মেজভাই প্রসন্ন গোপাল চৌধুরী, চতুর্থ ভাই নবকুমার চৌধুরী, ছোট ভাই নবকিশোর চৌধুরী প্রত্যেকে এক এক পরগনার জমিদার ছিলেন। তাদের জমিদারী সুদূর বাঁকড়া ও ঝিকরগাছা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রাণী রাশমনির মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি কন্যাদের মধ্যে বিভক্ত হয়। যদুনাথ চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার তৃতীয় পুত্র দূর্গাপ্রিয় চৌধুরী হোসেনপুর পরগনার(কলারোয়া) ও খুলনা কালেক্টরেটের ১৮, ২০ ও ২১ নং তৌজির এবং কয়েকটি তালুকের মালিক হন। রানী রাশমনি জমিদারী ক্রয়ের পূর্বে ইংরেজরা নায়েবের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছ থেকে জুলুম করে খাজনা আদায় করতেন। খাজনা বাকী থাকলে চাবুক মারা, পাগলা হাতি দিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙ্গা, বাঁশগাড়ি করা ছাড়াও ইংরেজ আমলে সোনাবাড়িয়ার জমিদারদের খাজনা আদায়ের ব্যতিক্রমধর্মী অত্যাচারের কাহিনী জানা যায়। খাজনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে কৃষকদের জমিদারের কাছারীর সম্মুখে প্রচন্ড প্রখর উত্তপ্ত টানা রোদ্রের মধ্যে খুটির সংঙ্গে পিঠমোড়া দিয়ে বেধেঁ রাখা হতো এবং জ্বলন্তপ্রায় সূর্যের দিকে মুখ করে একটানা তাকিয়ে থাকতে হতো।

রাণী রাশমনি নির্মিত সোনাবাড়িয়ার মঠবাড়ি

সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কৃষকদের প্রতি এ ধরণের চরম অত্যাচার করা হতো। প্রতিদিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই কঠিন্ ও কঠোর নিয়ম পালন করা হতো বলে ইংরেজরা এটাকে সানসেটল নামে আখ্যায়িত করেছিল। সোনাবাড়িয়া কাছারীর সন্মুখস্ত চত্বরে সূর্যের উত্তাপ অত্যন্ত প্রখর, প্রচন্ড ও অসহ্য ছিল। সারাদিন কাঠফাটা রোদের মধ্যে সূর্যের দিকে মুখ করে দাড়িয়েঁ েথকে কৃষকদের শরীরে ফোসকা পড়ে যেত। তাই একটি প্রবাদ ও প্রবচন আছে যে, “রোদ দেখো তো সোনাবেড়ের কাছারী যাও”। অবশ্য রাণী রাশমনি জমিদারী লাভ করলে এ নির্মম ও নিষ্ঠুর অত্যাচারের অবসান ঘটে।

রাণী রাশমনি ধর্মপ্রাণ বিদূষী মহিলা ছিলেন। ধর্ম প্রচারের জন্য তিনি বহু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মান করেছিলেন। পূণ্যশীলা রাণী প্রায়শঃ তীর্থ দর্শনে যেতেন। পুরীতে তিনি সেই সময় ষাট হাজার টাকা ব্যয় করে জগন্নাথ, বলরাম  ও শুভদ্রার জন্য তিনটি হীরার মুকুট তৈরি করে দিয়েছিলেন। তিনি সেখান থেকে পরে নবদ্বীপ ধামে যান। পরবর্তী উল্লেখযোগ্য ঘটনা ১২৫৪ বঙ্গাব্দে। রাণী ঠিক করলেন তিনি বিশেষভাবে অন্নপূর্ণা দর্শনে কাশী যাবেন। রেললাইন তখনও বসেনি। আবার জলে স্থলে সর্বত্র দস্যুর ভয়। তবুও তার পরদিন ভোরেই তীর্থযাত্রা শুরু হবে। হঠাৎ ঐরাত্রে জগৎজননী স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন, ‘এখানেই অর্থা৭ নবদ্বীপ ধামের গঙ্গাতীরে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে সেবার ব্যবস্থা করো, আমি এখানেই তোমার পূজা গ্রহন করব।’ প্রভাতে রাণীর কাশি যাওয়া স্থগিত হলো। রাণীর আদেশে কলকাতার গঙ্গার পূর্ব পাড়ে দক্ষিনেশ্বর  গ্রামে পঞ্চান্ন  বিঘা জমি ক্রয় করা হল। মন্দির নির্মাণের কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে।ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা এই সময় ঐ মন্দিরে পূজা করতে অসম্মতি জানালো এবং তারা মন্দির নির্মান কাজের বিরোধিতা শুরু করলেন। কারণ রাণ রাশমনি মহিষৎ সম্প্রদায়ের হিন্দু। ব্রাহ্মণ কর্তৃক মন্দির নির্মিত হতে হবে। রাণী এতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। উচু-নিচু ভেদাভেদ বিচার বিশ্লেষনের জন্য সময় নষ্ট না করে। তিনি একজন উচ্চ বর্ণের হিন্দু ব্রাহ্মণ পুরোহিতের কাছে জায়গা ও মন্দিরটি রেজিস্ট্রিপূর্বক হস্তান্তর করলেন এবং মন্দিরটি সম্পূর্ণরূপে নির্মাণের যাবতীয় ব্যবভার তিনি বহন করলেন। প্রায় নয় বৎসর পর ১২৬২ বঙ্গাব্দে দক্ষিনেশ্বর কালি মন্দিরের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। ১৮৫৫ খৃষ্টাব্দের ৩১ শে মে, বৃহস্পতিবার। শ্রী জগন্নাথ দেবের স্নান যাত্রার পবিত্র দিনে দক্ষিনেশ্বরের সেবালয়ে উদ্বোধনী উৎসব উদযাপিত হল। দেশ বিদেশ থেকে নিমন্ত্রিত লক্ষাধিক ব্রাহ্মণ এই উৎসবে উপস্থিত হয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং প্রখ্যাত লেখক নবীন কুমার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন। জীবনের মহান ব্রত সেদিনে উদযাপিত হওয়ার অভূতপূর্ব আনন্দঅশ্র নিয়ে রাণী লুটিয়ে পড়লেন ভবতারিনীর পাদপাদ্যে। বিগ্রোহের পূজা দিয়ে দিন কাটিয়েছিলেন রাণী।

কলকাতা কালী মন্দির

বিচক্ষনা রাণী রাশমনির পরমাহংসকে দিব্যচোক্ষে বুঝতে ভুল করেননি। বজ্রকঠিন পরিচয়ের সুবাদে তিনি বীরাঙ্গনা হিসেবে পুজিঁত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী। দেশ তখন বৃটিশের অত্যাচারে অতিষ্ট। বিশেষ করে বাঙালীদের মানসম্ভ্রম ও ধন-সম্পত্তি তখন বিপন্ন। রাণী বিপর্যস্ত বাঙালীদের পাশে দাড়িয়েছিলেন নির্ভিক চিত্তে। বৃটিশদের রাঙা চোখের সামনে তিনি কখনও ভীত হননি। একবার কলকাতার যানবাজারের জমিদারবাড়ী বৃটিশদের দ্বারা আক্রান্ত হলে রাণী রাশমনি মুক্ত কৃপান হাতে সারা রাত মন্দিরে দাড়িয়ে পাহারা দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, সেদিন যানবাজার থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত পুরো রাস্তা রানীর আদেশে বড় বড় গাছের গুড়ি ফেলে রেখে ইংরেজদের যাতায়াত ও চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেদিন ইংরেজ সরকারের টনক নড়েছিল। রাণীর বিরঙ্গনার পরিচয় দিতে গিয়ে অনেক ঘটনা ভীড় করে আসে স্মৃতিপটে। ১৮৬১ খৃষ্টাব্দের শুরুতে রাণী জ্বরে আক্রান্ত হলেন। বহু চিকিৎসকের চেষ্টা ব্যর্থ হলো। একই বৎসর ১৯শে ফেব্রুয়ারী বাংলা ১২৬৭ সালের ৯ ফাল্গুন গভীর রাত্রে রাণী রাশমনি পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিলেন। পরিসমাপ্তি ঘটলো তার কর্মবহুল জীবনের।

কলকাতার যানবাজারে রাণী রাশমনির বাড়ি

লেখক –

প্রফেসর  অধ্যক্ষ (অব:) মো: আবু নসর, সাবেক অধ্যক্ষ, কলারোয়া সরকারী কলেজ।

একই রকম অন্যান্য তথ্যসমূহ

কলারোয়ার সাধক যবন হরিদাস

    ১৪৫০ খ্রীষ্টাব্দে যবন হরিদাস কলারোয়া থানার কেঁড়াগছি গ্রামে জন্মগ্রহন।বিস্তারিত

পিরামিড আকৃতির প্রাচীন স্থাপত্য সোনাবাড়ীয়া মঠবাড়ি

সাতক্ষীরার কলারোয়ার সীমান্ত জনপদ সোনাবাড়িয়া গ্রাম। সবুজে ঘেরা ছোট্ট গ্রামটিবিস্তারিত

“জনপদের নাম কলারোয়া”

বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের সীমান্তবর্তী শস্য-শ্যামলা প্রশান্ত ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশে কলারোয়াবিস্তারিত