শনিবার, জুলাই ১১, ২০২০
প্রধান ম্যেনু

এক পাতায় কলারোয়ার সবকিছু

“জনপদের নাম কলারোয়া”

বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের সীমান্তবর্তী শস্য-শ্যামলা প্রশান্ত ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশে কলারোয়া উপজেলার অবস্থান। দেশের বহুল উচ্চারিত জনপদের নাম কলারোয়া। ১৮৫১ খৃীষ্টাব্দে সাতক্ষীরা মহকুমা সৃষ্টি হওয়ার পর মহকুমার সদর দফতর কলারোয়ায় স্থাপিত হয়।  শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অধিক উন্নত এবং অগ্রগামী ছিল বিধায় কলারোয়াতেই সাতক্ষীরা মহাকুমার প্রধান কার্যালয় স্থাপিত হয়েছিল। তাই উপমহাদেশের ইতিহাসে কলারোয়ার স্থান অত্যন্ত গৌরবজনক। নবগঠিত মহাকুমার প্রথম মহকুমা প্রশাসক ছিলেন জনাব আব্দুল লতিফ (পাবনা), যিনি পরবর্তীতে খান বাহাদুর উপাধি লাভ করেন। অবশ্য কলারোয়ায় দশ বৎসর  যাবৎ প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানোর পর ১৮৬১ সালে সাতক্ষীরার প্রভাবশালী জমিদারদের প্রচেষ্টায় মহকুমা সদর দপ্তর সাতক্ষীরাতেই স্থানান্তরিত হয়।  প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য যে, কলারোয়াতে কার্যালয় স্থাপন করে ১৮৫১ খৃষ্টাব্দে সাতক্ষীরাকে যশোর জেলার চতুর্থ মহকুমা হিসাবে সৃষ্টি করা হয়। পরে ১৮৬৩ খৃষ্টাব্দে ২৪ পরগনা জেলা সৃষ্টি হলে সাতক্ষীরা মহাকুমা ২৪ পরগনা  জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রকাশ থাকে যে, যশোর জেলা, খুলনা এবং ২৪ পরগনা জেলার অনেক আগে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৮১ সালের ৭ জুন অবিভক্ত বাংলার প্রথম জেলা যশোর জেলা গঠিত হয়। বর্তমানে যশোর জেলার বয়স ২২৮ বৎসরেরও বেশি। ফরিদপুর, ২৪ পরগনার কিছু অংশ, নদীয়া (বর্তমান কুষ্টিয়া) ও খুলনা নিয়ে যশোর জেলা গঠিত হয়। ১৮০০ সালে যশোর জেলা কালেক্টরেট বিল্ডিং নির্মিত হয়। যশোর জেলার প্রথম জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন ট্রীলম্যান হেংকেল। ১৮৮১ সালে খুলনা জেলা গঠিত হয়। মহকুমা হিসেবে  খুলনার আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৮৪২ সালে। উল্লেখ্য যে, কলারোয়া উপজেলার আয়তন ২৪৪ বর্গ কিঃমিঃ। ১২ টি ইউনিয়ন, ১টি পৌরসভা, ১১৭ টি মৌজা ও ১৫৩ টি গ্রাম আছে। জনসংখ্যা প্রায় আড়াই লক্ষ।

প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বহু পূর্বে কলারোয়ার অপর নাম হোসেনপুর। পরবর্তীকালে ইংরেজদের ও নীলকুটিয়ালদের ব্যবসা কেন্দ্র হোসেনপুর কলারোয়া নামে আত্মপ্রকাশ করে। জরিপ মানচিত্রে  কলারোয়া বলে কোন স্থান ছিল না। স্থানটির সরকারী নাম ঝিকরা, মৌজা ঝিকরা। অবশ্য পুরাতন রেজিস্ট্রিকৃত দলিলে একটি পরগণার নাম পাওয়া যায় সেটা হোসেনপুর পরগনা। পৃথক হোসেনপুরেরও কোন অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায় না।  তবে স্থানটি  এক সময় ২৪ পরগনা জেলার কলারোয়া হোসেনপুর  নামক একটি পরগনা  ছিল। কলারোয়ার নামকরণের  ইতিহাস বিভিন্ন তথ্য উদঘাটনের মাধ্যমে ও প্রবীনদের কাছ থেকে জানা যায় যে, উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বর্তমান কলারোয়ার পশুহাটের উত্তর পশ্চিম পার্শ্বে মিলঘরের পিছনে ইংরেজদের নীলকুঠি ছিল। অত্যাচারী নীলকর সাহেবদের বল্গাহীন নির্যাতন ও শোষনের সময় জমিদার  রাণী রাশমনির নায়েব ছিলেন শ্রীমোহন ঘটক। হোসেনপুর পরগনার জমিদার কলকাতার কর্পোরেশন স্ট্রীটে বসবাসকারী রাণী রাশমনির কাছে একদা নায়েব শ্রী মোহন ঘটক হিসাব-নিকাশ দাখিল করার জন্য উপস্থিত হন। রাণী

রাশমনির বড় মেয়ে রাণী জগদম্বাও মায়ের সাথে কলকাতার পিতৃগৃহে একত্রে বসবাস করতেন। এদিকে নীলকর সাহেবদের অমানুষিক, অসহ্য নির্যাতন ও অত্যাচারে অতিষ্ট এলাকার বিশেষ বিশেষ  লোকজন ও কৃষকরাও নীলকর সাহেবদের প্রতিকারের প্রার্থনা নিয়ে জমিদার রাণী রাশমনির নিকট গমন করেন। এ সময় বড় মেয়ে রাণী জগদম্বাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। রানী জগদম্বা নায়েব শ্রী মোহন ঘটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এর প্রতিকারের কোন ব্যবস্থা এ যাবৎ গ্রহন করা হয়েছে কি-না জানতে চান।  নায়েব শ্রী মোহন ঘটক নীলকর সাহেবদের এহেন চরম অত্যাচারকে মনে মনে ঘৃণা করতেন। নায়েব একজন স্বাধীনচেতা ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু ও জনবলের অভাবে তিনি সরাসরি কিছু করতে পারতেন না।

উপস্থিত বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিবর্গ এবং কৃষকরা নায়েব সাহেবের কাছে নীলকরদের অমানবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিকার ও প্রতিবাদের প্রার্থনা জানালেও কোন ফল হয়নি বলে জানান। কৃষকরা নায়েবের  উপর দোষারোপ করেন। তখন রাণী জগদম্বা নৈতিক সাহসের অভাব হেতু কাপুরুষতার জন্য নায়েব শ্রী মোহন ঘটককে তার মুখের উপর পুরুষ মানুষের পরিবর্তে “মেয়ে মানুষ” উপাধি বলে আখ্যায়িত করেন। রানী জগদম্বার কাছ থেকে “মেয়ে মানুষ” উপাধি পেয়ে রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে জেদী নায়েব শ্রী মোহন ঘটক মনে মনে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে হোসেনপুর (বর্তমানে কলারোয়া) ফিরে এলেন। এবার তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও শতাধিক কৃষকদের নিয়ে পরিকল্পনা মোতাবেক নীলকুঠিতে সহসা একদা রাতে অতর্কিত হামলা ও আক্রমণ চালিয়ে নীলকুঠি ভবনটি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে চুরমার করে বিধ্ব¯ত করে দিলেন। নীলকর সাহেবরা কোন রকমে পালিয়ে প্রাণ বাঁচালেন। ধ্বংসাবশেষ পাশ্ববর্তী বেত্রবতী নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হলো। তারপর কয়েকখানা লাঙ্গল চালিয়ে ঐ রাতেই ধ্বংসপ্রাপ্ত নীলকুঠি ভবনের উপর চাষ করা হল। সঙ্গে সঙ্গে মই দিয়ে মাটি সমান করে অসংখ্য কলাগাছ রুয়ে দেওয়া হল। রোপনকৃত কলাগাছের প্রবৃদ্ধি দেখে সবাই মুগ্ধ হলেন এবং আরো অধিক সংখ্যক নানা জাতের কলাগাছ রোপন করা হয়।  এই কলাগাছ রুয়া থেকে হোসেনপুর প্রথমে কলারুয়া এবং আরও পরে কলারোয়া নামে পরিচিতির মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে। অসংখ্য কলাগাছ রোয়ার পর একই রাতের নায়েব শ্রী মোহন ঘটক তার দলবল সহ বত্রিশদাঁড়ি মাঝিমাল্ল্যা নিয়ে ভোরে কলকাতার কর্পোরেশন স্ট্রীটে জমিদার রাণী রাশমনির বাস ভবনে উপস্থিত হয়ে সব ঘটনা  খুলে বললেন। জমিদার রাণী রাশমনি বাস ভবনে উপস্থিত তৎকালীন ছোট লাট এবং বিভাগীয় কমিশনারকে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য ঘটনাটি অবহিত করলেন। হোসেনপুরের নীলকুঠির অস্তিত¦ তখন সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়ায় বৃটিশ সরকার হোসেনপুর (কলারোয়া) থেকে নীলকুঠি প্রত্যাহার করেন। তবে নীল চাল বন্ধ হয়নি। উপসংহারে বলতে পারি কপোতাক্ষ, বেত্রবতী, ইছামতি,সোনাই বিধৌত বিভিন্ন তরুরাজির অপরুপ সবুজ শ্যামলিময় সমৃদ্ধ, বহু জ্ঞানী-গুণী মেধাবী বুদ্ধিজীবি, বিদগ্ধ পীরে কামেল ও আধ্যাত্মিক পুরুষের জন্মস্থান, নীলবিদ্রোহের পীঠস্থান, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দুর্ভেদ্য দূর্গ, মানুষের স্বপ্নরাজ্য ও কর্মস্থান, জাতীয় ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কর্মকান্ডের প্রাণকেন্দ্র, স্বপ্নের ইন্দ্রপুরী কলারোয়ার অতীত ও বর্তমান অত্যন্ত ঐতিহ্যমন্ডিত ও গৌরবময়। উপমহাদেশের ইতিহাসে কলারোয়ার স্থান অত্যন্ত গৌরবজনক বিধায় কলারোয়া বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সচেতন মানুষের  এক নন্দিত জনপদ।

পরিশেষে কবির ভাষায় বলতে হয়,

                                       “ মাথার উপর  নীল চাঁদোয়া, শষ্য শ্যামে গা নাওয়া

                                          চোখ জুড়ানো মন ভুলানো, স্বর্গোপমা কলারোয়া।”

লেখক –

প্রফেসর  অধ্যক্ষ (অব:) মো: আবু নসর, সাবেক অধ্যক্ষ, কলারোয়া সরকারী কলেজ।

একই রকম অন্যান্য তথ্যসমূহ

কলারোয়ার সাধক যবন হরিদাস

    ১৪৫০ খ্রীষ্টাব্দে যবন হরিদাস কলারোয়া থানার কেঁড়াগছি গ্রামে জন্মগ্রহন।বিস্তারিত

কলারোয়ার জমিদার রাণী রাশমনি

অকৃতোভয়, তেজস্বিনী, নির্ভিক বাঙালী বীরঙ্গনা রাশমুন ১৭৭৩ সালে ভারতের পশ্চিমবিস্তারিত

পিরামিড আকৃতির প্রাচীন স্থাপত্য সোনাবাড়ীয়া মঠবাড়ি

সাতক্ষীরার কলারোয়ার সীমান্ত জনপদ সোনাবাড়িয়া গ্রাম। সবুজে ঘেরা ছোট্ট গ্রামটিবিস্তারিত