শনিবার, জুলাই ১১, ২০২০
প্রধান ম্যেনু

এক পাতায় কলারোয়ার সবকিছু

পিরামিড আকৃতির প্রাচীন স্থাপত্য সোনাবাড়ীয়া মঠবাড়ি

সাতক্ষীরার কলারোয়ার সীমান্ত জনপদ সোনাবাড়িয়া গ্রাম। সবুজে ঘেরা ছোট্ট গ্রামটি সহজেই নজর কাড়ে প্রকৃতি দিয়ে। চোখে প্রশান্তি দেয় বনবীথি। সেই সঙ্গে মনকে কিছু সময়ের জন্য হলেও নিয়ে যায় মধ্যযুগে। ওই সময়ের অনেক নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সোনাবাড়িয়ায়। এসব পুরাকীর্তি দর্শনেও বোধ করি নিজের শিকড়ের খোঁজ পায় অনুসন্ধিত্সু মন। তবে পুরনো কোনো স্থাপনার জীর্ণ দালান যেন ওই সময়ের উপাখ্যান নিয়ে হাজির হয় কল্পনার আলোকে।

জেলা সদর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে সোনাবাড়িয়া গ্রামে ভগ্নদশায় দাঁড়িয়ে শ্যামসুন্দর মঠ মন্দির। ইট-সুড়কিতে গড়া দালানটির গায়ে খোদাই করে লেখা ‘শ্যাম সুন্দর নবরত্ন মন্দির’। প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো ৬০ ফুট উঁচু পিরামিড আকৃতির এ মঠ মন্দির প্রাচীন স্থাপত্যের এক অপরূপ নিদর্শন।

জরাজীর্ণ ও ভগ্নপ্রায় এ ঐতিহাসিক মঠ মন্দির সংরক্ষণ করার জন্য ২০১২ সালে উদ্যোগ নিলেও আজ পর্যন্ত কোনো সংস্কার করা হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সংস্কার করা না গেলে জাতীয় এ সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যাবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, শ্যামসুন্দর মঠ ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে জনৈক হরিরাম দাশ (মতান্তরে দুর্গাপ্রিয় দাশ) নির্মাণ করেছিলেন। এ পুরাকীর্তির সবচেয়ে বড় তিনতলাবিশিষ্ট নবরত্ন মন্দির। এটিই ‘শ্যামসুন্দর মন্দির’ নামে পরিচিত। এর সঙ্গে লাগোয়া দুর্গা ও শিব মন্দির। এ মন্দিরগুচ্ছের দক্ষিণে একটি চৌকো দীঘি আছে। মঠের নিচতলা ১০ দশমিক ৮২ মিচার/ ৩৫ ফুট ৬ ইঞ্চি বর্গাকার ভিত পরিকল্পনায় নির্মিত।

এর দ্বিতলের মাপ ১০ মিটার/ ৩২ ফুট ১০ ইঞ্চি ৯.৯৮ মিটার/ ৩২ ফুট ৯ ইঞ্চি ও ত্রিতল ৭.৪৬ মিটার/ ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি ৭.১৬ মিটার/ ২৩ ফুট ৬ ইঞ্চি। ফলে মন্দিরটি দেখতে ঠিক ত্রিকোণাকৃতির পিরামিডের মতো। দক্ষিণমুখী এ মন্দিরের নিচতলার ভেতরের অংশে চারটি ভাগ রয়েছে। প্রথম ভাগের চারপাশে রয়েছে ঘূর্ণায়মান টানা অলিন্দ। দ্বিতীয় ভাগে ৬.১৪ মিটার/ ২০ ফুট ২ ইঞ্চি পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা এবং ১.৩২ মিটার/ ৪ ফুট ৫ ইঞ্চি চওড়া একটি মণ্ডপ। তৃতীয় ভাগের পশ্চিম পাশের ও মাঝের কোঠাটির উত্তরে রয়েছে একটি করে প্রকোষ্ঠ।

পূর্বাংশের কোঠাটির পেছনে রয়েছে একটি অলিন্দ। সেখানে দ্বিতল ভবনে ওঠার সিঁড়ি। ধারণা করা যায়, পূর্ব ও পশ্চীি কোঠা দুটিতে সংরক্ষিত মূর্তির উদ্দেশে মন্দিরটি নিবেদিত ছিল। দ্বিতলে রয়েছে একটি দক্ষিণমুখী কোঠা। এর পরিমাপ ২.২৮ মিটার/ ৭ ফুট ৬ ইঞ্চি ১.৯৮ মিটার/ ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি। ত্রিতল ভবনটি তুলনামূলক ছোট। এর দক্ষিণ দিকের মধ্যের খিলানটির ওপর একটি পোড়া মাটির ফলক রয়েছে। শ্যামসুন্দর মঠের নিচে রয়েছে ৪৫.৭ সেন্টিমিটার/ ১ ফুট ৬ ইঞ্চি উঁচু নিরেট মঞ্চ। এর প্রত্যেক তলার ছাদপ্রান্ত ধনুকের মতো বাঁকা, কোণগুলো কৌণিক। এগুলোর ছাদের ওপর নানা আকারের গম্বুজের সমাহার, আর মাঝখানে তুলনামূলক বড় একটি রত্ন। তাই এটি ‘নবরত্ন স্মৃতি মন্দির’। নবরত্ন বা শ্যামসুন্দর মঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে আরো একটি দক্ষিণমুখী মন্দির আছে। সেটি দুর্গা মন্দির।

শ্যামসুন্দর মন্দিরের গাঘেঁষে পূর্বমুখী মন্দিরটিতে ৯১.৪৩ সেন্টিমিটার/ ৩ ফুট উঁচু একটি কালো পাথরের শিবলিঙ্গ আছে। এর ওপর একটি ভাষ্যফলক পাঠোদ্ধার অনুপযোগী অবস্থায় সংস্থাপিত। এর ছাদ চৌচালা, কার্ণিশ ধনুকাকারে বাঁকা এবং কোণগুলো কৌণিক। এটি ‘অন্নপূর্ণা মন্দির’। মন্দিরগুচ্ছের সবক’টি ইমারতে ২২.৮৫ সেন্টিমিটার, ২০.৩১ সেন্টিমিটার ও ২.৫৩ সেন্টিমিটার (৯ ইঞ্চি, ৮ ইঞ্চি ও ১ ইঞ্চি) পরিমাপের ইট ব্যবহূত হয়েছে। এগুলো থরে থরে সাজানো চুন-সুড়কি মিশ্রিত মসলা দিয়ে। বর্তমানে এ মন্দিরগুচ্ছ পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এর পাশে আরো আটটি (মতান্তরে ১০টি) মন্দির ছিল। অনেকের মতে, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব একসময় মন্দিরগুলো পরিদর্শনে এসেছিলেন। দুই মাস ছিলেন এখানে। তার হিন্দু পুণ্যার্থীদের কাছে এ মন্দিরের গুরুত্ব অনেক।

মঠ মন্দিরগুচ্ছের অল্প দক্ষিণে ‘জমির বিশ্বাসের পুকুর’ নামে একটি জলাশয় আছে। তার পাকা ঘাটে ব্যবহূত ইটের সঙ্গে ‘অন্নপূর্ণা মন্দির’-এর ইটের মিল পাওয়া যায়। তাতে ধারণা করা হয়, পুকুরটি একই সময়ে তৈরি। কিন্তু যত্ন ও সংস্কারের অভাবে জীর্ণতা ও জড়তায় যেন আরো নুইয়ে পড়ছে ইমারত।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মন্দিরগুচ্ছের সংরক্ষণের দায়িত্ব নিক— এটাই এলাকাবাসীর দাবি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে মঠটি সংরক্ষণ করা গেলে এটি হতে পারত সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সব মানুষের কাছে দর্শনীয় স্থান ও আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।

একই রকম অন্যান্য তথ্যসমূহ

কলারোয়ার সাধক যবন হরিদাস

    ১৪৫০ খ্রীষ্টাব্দে যবন হরিদাস কলারোয়া থানার কেঁড়াগছি গ্রামে জন্মগ্রহন।বিস্তারিত

কলারোয়ার জমিদার রাণী রাশমনি

অকৃতোভয়, তেজস্বিনী, নির্ভিক বাঙালী বীরঙ্গনা রাশমুন ১৭৭৩ সালে ভারতের পশ্চিমবিস্তারিত

“জনপদের নাম কলারোয়া”

বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের সীমান্তবর্তী শস্য-শ্যামলা প্রশান্ত ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশে কলারোয়াবিস্তারিত